Thursday, April 16, 2026
Google search engine
Homeবাংলাদেশচলে গেলেন ঐক্যের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া

চলে গেলেন ঐক্যের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া

আলতাফ হোসেন, প্রকাশক কথা নিউজ ২৪: বেগম খালেদা জিয়া (জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯৪৫, দিঞ্জপুর) ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তি এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল(BNP)-র চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একটি বিরাট রাজনৈতিক জীবনের মধ্য দিয়ে গেছেন।
 প্রারম্ভিক জীবন
খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন দিঞ্জপুরে (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত, এখন বাংলাদেশ)।
১৯৫৯ সালে তিনি জিয়াউর রহমান নামে একজন সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি স্বাধীনতার ঘোষক, পরবর্তীতে বাংলাদেশের  রাষ্ট্রপতি হন।
রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ ও বি এন পির নেতৃত্ব ১৯৮১ সালে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান এর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল (BNP)-র চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।  ১৯৮০ এর দশকে বাংলাদেশের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।  প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্যকাল প্রথম মেয়াদ (১৯৯১–১৯৯৬)
১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে BNP বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন — দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।
তার নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতিত্বমান স্তর থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর হয় এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রচেষ্টা শুরু হয়।

দ্বিতীয় মেয়াদ (১৯৯৬-১৯৯৬) সল্প সময়

তৃতীয় মেয়াদ (২০০১–২০০৬)
বিএনপি আবারো নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক অবস্থান
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা — বিশেষ করে শেখ হাসিনা-র সঙ্গে, যিনি আওয়ামী লীগের নেতা এবং বারংবার ক্ষমতায় ছিলেন। এই দ্বৈরথ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “দু’জন বেগমের রাজনীতিকাল” নামে পরিচিত।
আইনগত জট এবং তুলনামূলক পদক্ষেপ
সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে খালেদা জিয়া  মামলা ও বিচারালয় কার্যক্রমের শিকার হন, এবং এতে তিনি কারাগারে  পরিস্থিতিও ভোগ  করেন।

যদিও তিনি সব মামলায় খালাস পাননি, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি মূল মামলায় উচ্চ আদালত তাকে খালাস দেয়, যা তাকে রাজনীতিতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
সাম্প্রতিক অবস্থা ও মৃত্যু (২০২৫) বেগম খালেদা জিয়া মারা গেছেন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ এ, বয়স ৮০ বছর বয়ে় দীর্ঘ অসুস্থতার পর।
তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংক্ষিপ্ত সাংগঠনিক অবদান
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করেছেন।

দীর্ঘ সময় ধরে BNP-কে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রণালীতে বিরোধিতার শক্তিস্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচন, সরকারের নীতি, ও সাংগঠনিক সংস্কারে তার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বহুমাত্রিক ও বিতর্কিত নেতৃত্ব হিসেবে স্মরণীয়। তার জীবন রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সংগ্রাম ও দলের জন্য নিবেদন-সমস্তকেই প্রতিফলিত করে। তিনি নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা — দুই দিকেই প্রভাব ফেলেছেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর স্থান অমর।

গতকাল সকাল ৮টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহাব উদ্দীন তালুকদার বেগম খালেদা ইন্তেকালের কথা ঘোষণা করেন। আজ বাদ জোহর (বেলা ২টায়) জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জানাজা শেষে বেলা সাড়ে ৩টায় তাঁকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে শায়িত স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হবে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ জাতীয় ও বিশ্বনেতারা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় ড. ইউনূস বলেন, দেশের মানুষের হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া।  এদিকে জানাজায় অংশগ্রহণের সুবিধার্থে অতিরিক্ত মেট্রোরেল চলবে। এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে আজ এক দিনের সাধারণ ছুটি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সকাল সাড়ে দশটায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ আমন্ত্রণে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অংশ নেন। সভায় পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজা, দাফনসহ অন্যান্য কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সাহসী ও দ্যুতিময় মহীয়সী এই নারীর জীবনাবসানে শোকে কাঁদছে সমগ্র বাংলাদেশ। তিনি প্রতিরোধ, সাহস ও ঐক্যের প্রতীক ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্যের অবসানের মতো। সারাটি জীবন তিনি কেবল দিয়েই গেলেন, নিলেন না কিছুই। লড়াই করে গেছেন দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য। এই ত্যাগের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনবার তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফনকাজে নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১০ হাজার সদস্য কাজ করবেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মাঠে থাকবেন। আজ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের লাশ সংসদ ভবন পর্যন্ত নেওয়ার সময় পুরো রাস্তার দুই পাশে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হবে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে শোক ও পরিদর্শন বই খোলা হয়েছে। সেখানে গতকাল পর্যন্ত ২৮টি দেশের কূটনীতিক, কয়েকজন উপদেষ্টা, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা স্বাক্ষর করেছেন।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী এবং দেশবিদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নারী প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয় এ নেত্রী দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। শেষ সময়ে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরা জ্যেষ্ঠ পুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারসহ পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে দলীয়ভাবে সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এই সাত দিন দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা, দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণসহ নেতা-কর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ অন্যান্য দলীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়ার এই বিদায় শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর নয়, তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের সাহস। এটি মায়ের মতো সমগ্র জাতিকে আগলে রাখা এক অভিভাবকের বিদায়। তিনি নির্যাতিতকে সাহস দিয়েছেন, আশাহতকে ভরসা জুগিয়েছেন, হতাশ জনতাকে দেখিয়েছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ। ছিলেন একটি জাতির আত্মবিশ্বাস, সংগ্রামের প্রতীক। নির্যাতন, কারাবাস, দেশিবিদেশি শত ষড়যন্ত্রের মুখেও তিনি আজীবন আপসহীন থেকেছেন গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি মাথা নত করেননি, আপস করেননি কখনো। বরং দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন দৃঢ়চেতা মনোবল নিয়ে। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, মনে ছিল অটল বিশ্বাস, আর হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে ছিল বাংলাদেশ ও তার জনগণ।

গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর এই অবিচল মনোভাব আর সুদীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’, ‘ফাইটার অব ডেমোক্রেসি’সহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই মাদার অব ডেমোক্রেসি সম্মাননায় ভূষিত করে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন (সিএইচআরআইও)। ওই সময় তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের মিথ্যা মামলায় অসুস্থ অবস্থায় কারান্তরিন ছিলেন পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাভবনে। চিকিৎসা লাভের মৌলিক অধিকারটুকুও তাঁর কেড়ে নিয়েছিল স্বৈরাচার আওয়ামী সরকার। ঠিক সেই অবস্থায় কানাডীয় প্রতিষ্ঠানটি দেশনেত্রীকে মাদার অব ডেমোক্রোসি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এর প্রায় সাড়ে তিন বছর পরে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে কানাডার এই প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ক্রেস্ট ও সনদপত্র সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারা দেশে সর্বস্তরের মানুষ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকাচ্ছন্ন নেতা-কর্মীরা ভিড় করেছেন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এভারকেয়ার হাসপাতাল, চেয়ারপারসনের গুলশানের বাড়ি ও রাজনৈতিক কার্যালয় এবং নয়াপল্টন এলাকায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর সমর্থক ভক্ত, অনুসারী ও সাধারণ মানুষ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine
Google search engine

Most Popular