যেসব গ্রহ কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় না, বরং মহাশূন্যে একা ভেসে বেড়ায়; সেগুলোকে বলা হয় রোগ প্ল্যানেট। পৃথিবী থেকে ৬২০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ক্যামেলিয়ন গ্যালাক্সির এমনই এক রোগ প্ল্যানেট সিএইচএ ১১০৭-৭৬২৬। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির (ইএসও) ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ (ভিএলটি) থেকে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে গ্রহটির অদ্ভুত এক বৈশিষ্ট শনাক্ত করেছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। প্রতি সেকেন্ডে মহাকাশ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন (৬০০ কোটি) টন গ্যাস ও ধুলা টেনে নিচ্ছে গ্রহটি। আর কোনো রোগ প্ল্যানেট, এমনকি অন্য কোনো ধরনের গ্রহের ক্ষেত্রে এত দ্রুত বাড়ার প্রবণতা আগে কখনো দেখা যায়নি।
ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের (আইএনএএফ) পালারমো জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্রের জ্যোতির্বিদ ভিক্টর আলমেন্দ্রোস-আবাদের নেতৃত্বে একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্রহটিতে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে তার ভিত্তিতে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, যা গত বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) দি অ্যাস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল লেটারসে প্রকাশ হয়েছে। এজন্য চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত ইএসওর ভিএলটি টেলিস্কোপের এক্স শুটার স্পেক্টোগ্রাফ ও জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া এতে ইএসওর আরেক স্পেক্টোগ্রাফ সিনফোনির আগে সংগৃহীত তথ্যও সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
তাদের প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিএইচএ ১১০৭-৭৬২৬ গ্রহটির ভর বৃহস্পতির ভরের ৫ থেকে ১০ গুণ। এখনো গঠনের পর্যায়ে থাকা গ্রহটি চারপাশের গ্যাস ও ধূলির চাকতির (ডিস্ক) বস্তুগুলোকে ক্রমাগত টেনে নিচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘অ্যাক্রিশন’। তবে গ্রহটির পদার্থ শোষণের হার স্থিতিশীল নয়। চলতি ২০২৫ সালের আগস্টে গ্রহটির আশপাশের গ্যাস ও ধূলি শোষণের হার কয়েক মাস আগের তুলনায় আট গুণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে ৬০০ কোটি টনে।
ভিক্টর আলমেন্দ্রোস-আবাদ বলেন, এটি গ্রহতুল্য কোনো বস্তুর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যাক্রিশন পর্ব।
তিনি বলেন, ‘মানুষের দৃষ্টিতে সৌরজগতের গ্রহগুলো আসলে স্থিতিশীল ও নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে অবস্থানকারী জগত। কিন্তু আমরা দেখতে পেয়েছি গ্রহতুল্য ভরবিশিষ্ট বস্তুগুলো মহাশূন্যে ভাসমান অবস্থায়ও ভীষণ সক্রিয় হতে পারে।
গবেষণা প্রতিবেদনের সহলেখক যুক্তরাজ্যের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ অ্যালেক্স শোলজ বলেন, ‘রোগ প্ল্যানেটের উৎপত্তি নিয়ে এখনো রহস্য রয়ে গেছে—এগুলো কি নক্ষত্রের মতোই ভরবিশিষ্ট নাকি জন্মস্থান থেকে বহিষ্কৃত কোনো দৈত্যাকৃতির গ্রহ? পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে অন্তত কিছু রোগ প্ল্যানেট নক্ষত্রের মতো একই প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠতে পারে। কারণ নক্ষত্রের ক্ষেত্রেও এ ধরনের আকস্মিকভাবে পদার্থ শোষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আগে দেখা গেছে।’
গবেষণা প্রতিবেদনের আরেক সহলেখক বেলিন্ডা ডেমিয়ান বলেন, ‘এই আবিষ্কার নক্ষত্র আর গ্রহের মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে এবং রোগপ্ল্যানেটের জন্ম ও বেড়ে ওঠার পর্বের এক ঝলক আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।’



