বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বৃহত্তম পরিবেশ বিষয়ক পুরস্কার দ্য আর্থশট প্রাইজ ২০২৫-এর ‘ফিক্স আওয়ার ক্লাইমেট’ ক্যাটাগরিতে ফাইনালিস্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে দেশের স্বনামধন্য সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা- ফ্রেন্ডশিপ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা ও টেকসই সমাধান প্রদর্শনের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পরিবেশ পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশী সংস্থা ফ্রেন্ডশিপকে মনোনীত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আর্থশট ফাউন্ডেশন রোববার (৫ অক্টোবর) অনলাইনে দ্য আর্থশট প্রাইজ ২০২৫ ঘোষণা দেয়।
আর্থশট ফাইনালিস্ট হওয়ার মাধ্যমে আগামী এক বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ফ্রেন্ডশিপ-এর ম্যানগ্রোভ সংক্রান্ত কার্যক্রম তুলে ধরা, জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে ফ্রেন্ডশিপ-কে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা, আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগের তৈরিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে দ্য আর্থশট প্রাইজ কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, যেখানে বারবার ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও উপকূলীয় দুর্যোগ লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করছে। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জলবায়ু দুর্যোগে ১ কোটি ৪৭ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে ফ্রেন্ডশিপ কাজ করছে একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে—স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইন ও সরকারি সেবা প্রাপ্তি, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠন—সবই বাংলাদেশের সবচেয়ে দূরবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য।
পানির স্তরের বৃদ্ধি মোকাবিলা করতে সক্ষম উঁচু ভিত্তির পুনর্গঠনযোগ্য আবাসন ও স্কুল নির্মাণের পাশাপাশি ফ্রেন্ডশিপ বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলবর্তী সুন্দরবনের নিকটে ২০০ হেক্টরেরও বেশি এলাকায় ৬ লক্ষ ৫০ হাজার ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণ করেছে যা সর্বসাকুল্যে ৬২ কিলোমিটারের বেশি।
এই ম্যানগ্রোভ বন শুধু প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ঙ্কর প্রভাব থেকে গ্রামগুলোকে রক্ষা করছে না, বরং এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে এটি স্থানীয় জনগণের জীবিকার সুযোগ তৈরি করছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্বন সিঙ্ক হিসেবে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ও সংরক্ষণ করছে। এর মাধ্যমে নীল কার্বন বাস্তুতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং বিকশিত নীল অর্থনীতির ভিত্তিতে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হচ্ছে।
২০০২ সালে রুনা খান প্রতিষ্ঠিত ফ্রেন্ডশিপ, একটি মাত্র ভাসমান হাসপাতাল থেকে যাত্রা শুরু করে আজ নিবেদিতপ্রাণ সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠান, যা প্রতিবছর সরাসরি ৭৫ লাখেরও বেশি মানুষকে সেবা প্রদান করে। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, ৮৩ লাখ দিনের জরুরি খাদ্য সহায়তা বিতরণ করেছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিদিন ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ পানীয় পানির অ্যাক্সেস নিশ্চিত করছে।
ফ্রেন্ডশিপ ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু জলবায়ু-সংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাস করাই নয়, বরং স্থানীয় জনগণের সহনশীলতা, মর্যাদা, আর্থসামাজিক সুযোগ এবং জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত, পরিবেশগতভাবে টেকসই, পুনরাবৃত্তিযোগ্য এবং অনুরূপ ভঙ্গুর ভূখণ্ডে প্রসারযোগ্য সিস্টেমের মাধ্যমে।
২০২০ সালে ব্রিটেনের প্রিন্স উইলিয়াম দ্য আর্থশট প্রাইজের সূচনা করেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করে জলবায়ু ও পরিবেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবদান রাখছে এই পুরস্কার।
আর্থশট প্রাইজ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি প্রিন্স উইলিয়াম বলেন, “আমরা এ বছর আমাদের দশ বছরের মিশনের অর্ধেক পথে এসেছি, এবারের ফাইনালিস্টরা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। মাত্র পাঁচ বছরে আর্থশট প্রাইজ দেখিয়ে দিয়েছে যে আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান ইতিমধ্যেই বিদ্যমান এবং আমাদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে।”
ফ্রেন্ডশিপ-এর প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান বলেন, “আর্থশট প্রাইজ ফাইনালিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আমাদের জন্য এক বিশাল সম্মান। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃঢ়তা ও উদ্ভাবনকে এটি তুলে ধরছে। প্রথম ভাসমান হাসপাতাল থেকে শুরু করে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার ও বন্যা সহনশীল গ্রাম নির্মাণ—আমরা প্রমাণ করেছি যে কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান জীবন বদলে দিতে পারে।”
প্রায় ৭২টি দেশের ২,৫০০ মনোনয়নের মধ্য থেকে নির্বাচন করে ‘ক্লিন আওয়ার এয়ার’, ‘রিভাইভ আওয়ার ওশানস’, ‘প্রোটেক্ট এন্ড রিস্টোর ন্যাচারস’, ‘বিল্ড এ ওয়েস্ট ফ্রি ওয়ার্ল্ড’, ‘ফিক্স আওয়ার ক্লাইমেট’ ক্যাটাগরিতে ১৫টি ফাইনালিস্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। এদের মধ্য থেকে ৫ জন বিজয়ী হবেন, যাদের নাম ঘোষণা হবে ৫ নভেম্বর, রিওতে অনুষ্ঠিত আর্থশট প্রাইজ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে।
এ বছর প্রায় ২,৫০০ জনের মধ্য থেকে ৭২টি দেশের ৫৭৫ জন নমিনেটরের মাধ্যমে জমা দেওয়া মনোনয়ন থেকে চূড়ান্ত বাছাই করা হয়েছে। এদের মধ্য থেকে ১৫ জন ফাইনালিস্টকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাদের মূল্যায়ন করেছেন আর্থশট প্রাইজের সিলেকশন পার্টনার ও এক্সপার্ট অ্যাডভাইজরি প্যানেল—যা সংরক্ষণ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, অর্থনীতি, একাডেমিয়া ও নীতিনির্ধারণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ১০০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত।
আগের বছরের মতো এ বছরও ৫ জন বিজয়ী নির্বাচন করবেন প্রিন্স উইলিয়াম এবং তার সঙ্গে আর্থশট প্রাইজ কাউন্সিলের সদস্যরা—যারা জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ। আর্থশট প্রাইজ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডেম ক্রিস্টিয়ানা ফিগারেস, যিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তির স্থপতি এবং আর্থশট প্রাইজ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান।
আর্থশট প্রাইজ কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রিন্স উইলিয়াম, মহামান্য রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ, অভিনেত্রী কেট ব্ল্যানচেট, ইন্দ্রা নুই, হোসে আন্দ্রেস, ওয়ানজিরা মাথাই, নেমনটে নেনকুইমো, লুইসা নয়বাউয়ার, নাওকো ইয়ামাজাকি, আর্নেস্ট গিবসন এবং ড. এনগোজি অকোনজো-ইওয়েলা।
এবার নির্বাচিত সমাধানগুলো পাঁচটি ‘আর্থশট’ লক্ষ্য অনুযায়ী সাজানো হয়েছে—যা অনাড়াম্বরপূর্ণ হলেও উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং অনুপ্রেরণামূলক এবং আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।



