বশিরুল আলম, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গাঃপ্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দখল, ভরাট আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসা আলমডাঙ্গার ডামোশ-ঘোলদাড়ি খাল আবারও ফিরে পাচ্ছে তার প্রাণ। একসময় কৃষি ও পানি নিষ্কাশনের প্রধান ভরসা ছিল যে জলধারা, সেটিই এখন পুনরুজ্জীবনের পথে—যা ঘিরে স্থানীয় মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নতুন আশা ও প্রত্যাশা। আগামী ১১ এপ্রিল খালটির খননকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরি এ্যানি। ইতোমধ্যে উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে এলাকায় চলছে প্রস্তুতি। বেলগাছি ইউনিয়নের কাশিপুর মোড়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ছোট পরিসরের একটি মঞ্চ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ। ডামোশ-ঘোলদাড়ি খালটি ভাটুই নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল একসময় দুই ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল। কৃষিজমিতে সেচের জন্যও এটি ছিল প্রধান উৎস।কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দখল, অপরিকল্পিত ভরাট এবং নিয়মিত খননের অভাবে খালটির পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও খালের জায়গায় চাষাবাদ, কোথাও পুকুর, আবার কোথাও বসতঘর—এভাবেই ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে খালটির অস্তিত্ব। প্রথম ধাপে প্রায় ৭ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। পরবর্তীতে বাকি অংশও অন্য প্রকল্পের আওতায় খননের পরিকল্পনা রয়েছে। চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী আরিফ আহম্মেদের ভাষ্য, খনন শেষ হলে খালটির পানি ধারণ ও প্রবাহ ক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এতে কৃষিজমিতে সেচ সহজ হবে এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমে আসবে।
স্থানীয় কৃষকদের কাছে এই খাল শুধু একটি জলধারা নয়, বরং জীবিকার মূল ভিত্তি। তাদের মতে, খালটি সচল থাকাকালে সেচ খরচ ছিল কম এবং উৎপাদন ছিল বেশি। কিন্তু খালটি নাব্যতা হারানোর পর তাদের নির্ভর করতে হয়েছে গভীর নলকূপ ও যান্ত্রিক সেচের ওপর—যা ব্যয়বহুল।
ডামোশ গ্রামের এক কৃষক বলেন,
“এই খাল যদি আগের মতো চলে, তাহলে আমাদের খরচ অনেক কমে যাবে। ফসলও বেশি হবে।”
খালটি শুধু কৃষির জন্য নয়, পৌর এলাকার পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকার কারণে বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, খননকাজ সম্পন্ন হলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে আসবে এবং শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে। তবে খাল পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে দখল ও দূষণ সমস্যা। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের অনেক অংশ প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। এছাড়া কিছু অটো রাইস মিল ও মুরগির খামারের বর্জ্য খালে ফেলা হচ্ছে, যা পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও এসব অনিয়মের চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন।বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল খনন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এটিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখা।
এলাকাবাসীর দাবি—
খালের দুই পাড়ে স্থায়ী চিহ্নিতকরণ
দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারি
নিয়মিত খনন ও পরিচর্যা উন্নয়নের পথে এক বড় পদক্ষেপ।
ডামোশ-ঘোলদাড়ি খালের পুনরুজ্জীবন শুধু একটি খাল খনন প্রকল্প নয়; এটি একটি অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবন পুনর্গঠনের উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের অবহেলার পর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বদলে যেতে পারে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র।
এখন দেখার বিষয়—উদ্বোধনের পর কত দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় এই প্রকল্প, আর কতটা সফলভাবে খালটি রক্ষা করা যায় ভবিষ্যতের জন্য।



