যাকে প্রায়শই ‘পাপ’ বা নিছক সময় নষ্ট বলে অবজ্ঞা করা হয়, সেই পরচর্চাই হতে পারে মানব সমাজের অন্যতম চালিকাশক্তি। এটি কেবল কারও অনুপস্থিতিতে বিদ্বেষপূর্ণ আলোচনাই নয়, বরং মানুষের সামাজিক যোগাযোগ, টিকে থাকা এবং জোট গঠনের এক জরুরি অনুষঙ্গ। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এর উপস্থিতি দেখে নৃবিজ্ঞানীরাও বলছেন, পরচর্চা মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি।
কিন্তু পরচর্চা বলতে ঠিক কী বোঝায়? ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. নিকোল হাইজেন হেসের মতে, এর পরিধি আমাদের ধারণার চেয়েও ব্যাপক। তিনি বলেন, ‘গসিপ বলতে কেবল কারও ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত তথ্য বিনিময়কেই বোঝায় না, সংবাদ প্রতিবেদন বা খেলার ফলাফল নিয়ে আলোচনাও এর অন্তর্ভুক্ত।’ ড. হেসের মতে, এই আলোচনা তৃতীয় পক্ষের সামনেও হতে পারে, এর জন্য সেই ব্যক্তির অনুপস্থিতি জরুরি নয়।
পরচর্চা: সামাজিকতার শক্তিশালী আঠা
মানুষ কেন পরচর্চা করে, এই প্রশ্নের উত্তরে বিবর্তনবাদী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক রবিন ডানবার এক যুগান্তকারী তত্ত্ব দিয়েছেন। তার মতে, আদিম প্রাইমেটদের মধ্যে একে অপরের যত্ন নেওয়া বা ‘গ্রুমিং’ যেমন সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করত, মানুষের সমাজে ভাষার মাধ্যমে করা ‘পরচর্চা’ ঠিক একই ভূমিকা পালন করে। ডানবারের দাবি, ‘ভাষার উদ্ভবই হয়েছে গসিপ করার জন্য।’
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পরচর্চার মাধ্যমে আমরা সম্পর্ক গড়ি, জোট তৈরি করি এবং কাকে বিশ্বাস করা যায় বা যাবে না, সেই সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তথ্য বিনিময় করি।
ডানবারের এই তত্ত্বকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১ সালের একটি গবেষণা। গবেষণায় দেখা যায়, যারা একসঙ্গে খোশগল্প বা পরচর্চায় অংশ নেন, তারা কেবল একে অপরের ঘনিষ্ঠই হন না, বরং তাদের মধ্যে দলীয় সহযোগিতাও বৃদ্ধি পায়। গবেষকদের ভাষায়, ‘গসিপ আমাদের আশপাশের মানুষদের নিয়ে অলস কথাবার্তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল একটি বিষয়।’
‘নরমাল গসিপ’ নামক পডকাস্টের উপস্থাপক কেলসি ম্যাককিনিও মনে করেন, একটি মজার গল্প অপরিচিতদেরও এক নিমিষে কাছে টেনে আনতে পারে, যা কোভিডের কোয়ারেন্টাইনের সময় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
টিকে থাকার কৌশল এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ
পরচর্চার কেবলই এই একটি দিক নেই। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টিকে থাকার কৌশল। ড. হেসের মতে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যেখানে শারীরিক শক্তির ঘাটতি থাকতে পারে, সেখানে নারীরা নিজেদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিপদ থেকে পরস্পরকে রক্ষা করে।
আমাদের সামাজিক অবস্থান এবং টিকে থাকা অনেকাংশেই সুনামের ওপর নির্ভরশীল। ড. হেস যুক্তি দেন, ‘নেতিবাচক পরচর্চা আপনার সামাজিক অবস্থানের ক্ষতি করতে পারে, আয়ের পথ সংকুচিত করতে পারে এবং এমনকি মৌলিক চাহিদা পূরণও কঠিন করে তুলতে পারে।’ এ কারণে মানুষ নিজের সুনাম রক্ষা করতে এবং কখনও কখনও প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেয় করতেও পরচর্চাকে একটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
বিনোদনের সহজলভ্য উৎস
এতসব জটিল তত্ত্বের বাইরেও পরচর্চার সবচেয়ে সাধারণ রূপটি হলো বিনোদন। পডকাস্টার ম্যাককিনি, যিনি একসময় পরচর্চাকে ‘পাপ’ বলে জানতেন, এখন নিজেকে এর ‘বিশেষজ্ঞ’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘হে বিধাতা, যদি পৃথিবীতে গসিপ বা পরচর্চা না থাকত তবে এই পৃথিবীটা কি বোরিং বা বিরক্তিকর হতো!’
সুতরাং মজা, টিকে থাকা বা যোগাযোগ—কারণ যা-ই হোক না কেন, পরচর্চা মানব সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ড. হেসের কথায়, ‘এটা মানুষের স্বাভাবিক আচরণ যেটিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। এর একটি সত্যিকারের প্রভাব আছে।’



