২৩৭টি গরু চালান এসেছে সীমান্ত গলিয়ে সিলেটের বিছনাকান্দিতে। বিজিবি’র কাছে আগেই খবর ছিল। এ কারণে স্থানীয় টিম ছাড়াও সিলেট থেকে নেয়া হয় বিজিবি’র আরও একটি বিশেষ টিম। যৌথ টিম একসঙ্গে চালায় অভিযান। ধরা পড়ে গরুর বড় চালান। গতকাল এ নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন ৪৮ বিজিবি’র সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ। তিনি জানিয়েছেন, সিলেটের সীমান্ত এলাকার ইতিহাসে এত বড় গরুর চালান আগে কখনো ধরা পড়েনি। বিজিবি সদস্যরা খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে এই চালান আটক করেন। এর বাইরে ছাতক থেকে আরও ৪২টি মহিষ আটক করা হয়।
এই চালানের আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। সিলেটের বিছনাকান্দি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। থানা থেকে অনেক দূরের পথ। বিজিবি টহলে থাকে। জাফলং, কোম্পানীগঞ্জে বিজিবি ও পুলিশের কড়াকড়ির কারণে গত এক বছর ধরে বিছনাকান্দিকেই চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছিল চোরাকারবারিরা। সিলেট অঞ্চলে গরু ও মহিষের চোরাচালানের রুট হিসেবে বিছনাকান্দি বহুল পরিচিত। প্রতিদিন কয়েকশ’ গরু-মহিষ ভারত থেকে আসে। আর বিছনাকান্দির পরিচিত চোরাকারাবারিরা এই রুট নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে বিছনাকান্দি দিয়ে স্রোতের মতো আসছে গরু ও মহিষের চালান। সীমান্তের পাশেই দু’টি বাজার। একটি হচ্ছে হাদারপাড় ও অন্যটি হচ্ছে পীরের বাজার। এই দুই বাজারে উঠলেই বৈধ হয়ে যায় ভারত থেকে আসা কোটি কোটি টাকার পশু। এর বাইরে জিরা, চিনি, মাদক সহ নানা পণ্য অবাধে আসে বিছনাকান্দির বগাইয়া গ্রামের সীমান্ত দিয়ে। স্থানীয় চোরাকারবারি কয়েস আহমদ হচ্ছে ওই রুটের নিয়ন্ত্রক। এলাকায় রয়েছে তার নিজস্ব বাহিনী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সে যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতো। দৃশ্যপট পাল্টানোর পর সে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে।
বিজিবি’র লাইনম্যান হিসেবে তাকে চেনেন সবাই। মূলত তার হাত ধরেই প্রতিদিন ওই সীমান্ত দিয়ে কোটি কোটি টাকার গরু, মহিষ ও চোরাই পণ্য নামছে। গোটা বিছনাকান্দি এলাকার নিয়ন্ত্রক গোলাম হোসেন নামের চিহ্নিত এক চোরাকারবারি। কয়েসের হাত ঘুরে পশু ও চোরাই পণ্যের চালান আসে গোলাম হোসেনের কাছে। আর বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় বিছনাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও হাদারপাড় বাজারের ইজারাদার জালাল আহমদ। বাজারে উঠলেই সিট দিয়ে পশু বাইরে চালান দেয়া হয়। স্থানীয়দের মতে, মূলত এই তিনজনের সিন্ডিকেটই পরিচালনা করে বিছনাকান্দির চোরাই রাজ্য। তাদের কাছে অসহায় স্থানীয়রা। কেউ প্রতিবাদ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তাদের হেনস্তা করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বুধবার বিজিবি’র হাতে আটক হওয়া ২৩৭টি চোরাই গরুর নিয়ন্ত্রক তারা তিনজনই। তাদের হাত ধরে এই গরুর চালান সীমান্তের একাধিক পয়েন্ট দিয়ে নামে। এরপর সেগুলো পীরের বাজারে নিয়ে যাওয়ার পথে বিজিবি’র সদস্যরা আটক করেন। তারা জানান, বিছনাকান্দি বিজিবি’র বিওপিতে আগে যে কর্মকর্তা ছিলেন তাকে সম্প্রতি বদলি করা হয়। এখন নতুন ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন। তিনি যোগদান করে চোরাকারবারিদের সতর্কবার্তা দিলেও তারা থামেনি। বিছনাকান্দির চোরাচালান নিয়ে বিজিবি এখন সতর্ক। শুধু ভারত থেকে আসা পশুর চালানই নয়, অন্যান্য সব মালামাল ধরতে বিজিবি অ্যাক্টিভ হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বিছনাকান্দি রুট হচ্ছে ভারতীয় জিরার চোরাচালানেরও অন্যতম নিরাপদ রুট। এ রুট দিয়ে আসা কয়েক কোটি টাকার জিরার চালান এখন লুকিয়ে বাসা-বাড়িতে রাখা হয়েছে।
এদিকে, চোরাই সিন্ডিকেটের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন স্থানীয় মেম্বার ও হাদারপাড় বাজারের ইজারাদার জালাল আহমদ। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করে গোলাম হোসেন, কয়েস আহমদ, খালিক, রহিম সহ কয়েকজন। তারাই বিভিন্ন লাইনের টাকা তুলে গোটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তার বাজারে গরু উঠলে বিক্রি হয়। তবে, সেটি হাট বারে বিক্রি হয়। পাশের আরেকটি হাটে চোরাই পশু বিক্রি হয় বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, আমি একজন জনপ্রতিনিধি। অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ ব্যাপারে চোরাকারবারি গোলাম হোসেনের মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করলেও নিজেকে গোলাম হোসেন বলে পরিচয় দেননি। তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এদিকে, চোরাই সিন্ডিকেটের সঙ্গে স্থানীয় বিটের পুলিশের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বারবারই আসে। চোরাকারবারিদের হাতে লাইন বিক্রিরও অভিযোগও ওঠে। সম্প্রতি এ লাইন বিক্রি নিয়ে খোদ গোয়াইনঘাট পুলিশের ভেতরেই তোলপাড় হয়। অভিযোগে তীরবিদ্ধ হন স্থানীয় বিট অফিসার ও গোয়াইনঘাট থানার এসআই জহরলাল। তিনি গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, বিছনাকান্দিতে পুলিশের কোনো লাইন নেই। সম্প্রতি একটি পক্ষ এই লাইন নিয়ে ঝামেলা করেছে। এ কারণে এত বড় চালান আটক হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে, সীমান্তে কড়াকড়ি হলে চোরাচালানের পণ্য ভেতরে ঢুকতে পারবে না বলে জানান তিনি। বলেন, পুলিশ সক্রিয় থাকার কারণে চোরাকারবারিরা প্রকাশ্যে কিছু করতে পারে না। নতুন করে এই এলাকায় পুলিশ অ্যাকশনে যাবে বলে জানান তিনি।



