Saturday, June 6, 2026
Google search engine
Homeবাংলাদেশহাসপাতালের জমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ এলাকাবাসী আলমডাঙ্গার ফরিদপুরে দানবীরের অর্পিত জমি রক্ষায় আবেগ,...

হাসপাতালের জমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ এলাকাবাসী আলমডাঙ্গার ফরিদপুরে দানবীরের অর্পিত জমি রক্ষায় আবেগ, প্রতিবাদ ও জনতার অঙ্গীকার

বশিরুল আলম, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, চুয়াডাঙ্গাঃ একটি হাসপাতাল শুধু ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়।
একটি হাসপাতাল মানে— অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়, মায়ের নিরাপদ মাতৃত্ব, নবজাতকের প্রথম কান্না, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার স্বপ্ন এবং মানবতার এক নীরব বাতিঘর। আর সেই স্বপ্নকেই বুকের ভেতর ধারণ করে বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করে আসছেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের মানুষ।সেই স্বপ্নের নাম— “লুৎফন নেছা মা-শিশু ও সাধারণ হাসপাতাল”।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে দান করা হাসপাতালের সেই নির্ধারিত জমি এখন জালিয়াতি ও অবৈধ বিক্রির ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে। আর এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে পুরো এলাকা। সাধারণ মানুষ, সচেতন মহল, যুবসমাজ ও প্রবীণরা এক কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন—“হাসপাতালের জমি কোনোভাবেই বিক্রি হতে দেওয়া হবে না।”স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আলমডাঙ্গা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন ফরিদপুর মৌজার খতিয়ান নং- ২০৯৯ এবং দাগ নং- ৩৫২০, ৩৫২১, ৩৫২২ ও ৩৫২৩-এর আওতাভুক্ত মোট ৯৯ দশমিক ৮৪ শতক জমি “লুৎফন নেছা মা-শিশু ও সাধারণ হাসপাতাল”-এর নামে নির্ধারিত। বর্তমানে সেখানে ঈদগাহ ময়দান থাকলেও মূলত জায়গাটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্দেশ্যেই দান করা হয়েছিল।এই জমির দাতা ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট দানবীর ও সমাজসেবক জোহা সাহেব। মানবসেবার মহান উদ্দেশ্যে তিনি হাসপাতালের নামে দলিল সম্পন্ন করে জমিটি দান করে যান। তাঁর স্বপ্ন ছিল— এই অঞ্চলের মা ও শিশুদের জন্য একটি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠবে, যেখানে দরিদ্র মানুষ বিনা হয়রানিতে চিকিৎসাসেবা পাবে। গ্রামের প্রবীণদের কণ্ঠে আজও ভেসে আসে সেই স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতা।

একজন প্রবীণ বলেন, “জোহা সাহেব শুধু জমি দান করেননি, মানুষের জন্য একটি ভবিষ্যৎ রেখে গেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, গরিব মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়।”সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, জোহা সাহেবের কিছু শরিক ব্যক্তি বিভিন্ন জাল কাগজপত্র তৈরি করে হাসপাতালের জমি বিক্রির পাঁয়তারা করছে। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থের সম্পদ, একটি মানবিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি। এই জমি রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসাসেবা রক্ষা করা।
একজন স্থানীয় যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“এই জায়গা নিয়ে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা শুধু জমি দখল করতে চায় না— তারা মানুষের আশা-ভরসাও কেড়ে নিতে চায়।”আরেক প্রবীণ ব্যক্তি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“আজ যদি হাসপাতালের জমি বাঁচানো না যায়, তাহলে সমাজে দানশীলতার সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে কেউ আর মানুষের জন্য কিছু দান করতে সাহস পাবে না।”
বর্তমানে ওই স্থানে এলাকার ঈদগাহ ময়দান অবস্থিত। বছরের পর বছর ধরে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও জায়গাটি পরিচিত। ফলে জমিটির সঙ্গে মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।স্থানীয়দের মতে, এই জায়গাটি শুধু একটি খালি জমি নয়— এটি এলাকার মানুষের আত্মার অংশ। এখানে একদিকে ধর্মীয় সম্প্রীতির চর্চা হয়, অন্যদিকে ভবিষ্যতের হাসপাতালের স্বপ্ন মানুষকে আশাবাদী করে রাখে।আলমডাঙ্গা ও আশপাশের বহু গ্রামের মানুষ এখনও উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক রোগীকেই চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী জেলা শহর কিংবা বড় হাসপাতালে ছুটতে হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ভোগ করতে হয়। এমন বাস্তবতায় “লুৎফন নেছা মা-শিশু ও সাধারণ হাসপাতাল” শুধু একটি ভবন নয়— এটি পুরো অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা নিরাপত্তার প্রতীক।তাই হাসপাতালের জমি রক্ষার দাবিতে এখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠ আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
এলাকাবাসী প্রশাসনের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, জমির প্রকৃত কাগজপত্র যাচাই করে হাসপাতালের নামে দানকৃত সম্পত্তি সুরক্ষিত করতে হবে। একইসঙ্গে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, প্রশাসন সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নিলে একটি মহৎ উদ্যোগ রক্ষা পাবে এবং দানবীর জোহা সাহেবের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে। ফরিদপুর গ্রামের বাতাসে এখন একটাই উচ্চারণ—
“এই জমি জনগণের, মানবতার, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। কোনো লোভী চক্রের হাতে তা তুলে দেওয়া হবে না।”
মানুষ বিশ্বাস করে, একটি হাসপাতাল গড়ে উঠলে হাজারো অসহায় মানুষ নতুন জীবন পাবে। তাই হাসপাতালের নির্ধারিত জমি রক্ষার আন্দোলন এখন শুধুই জমির লড়াই নয়— এটি মানবতা, ভবিষ্যৎ এবং জনকল্যাণ রক্ষার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
দানবীরের সেই স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে। আর সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে জেগে উঠেছে পুরো এলাকাবাসী।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine
Google search engine

Most Popular

Recent Comments