Saturday, April 18, 2026
Google search engine
Homeজীবনযাপনপাহাড়ের সাম্যবাদী জুম সমাজ

পাহাড়ের সাম্যবাদী জুম সমাজ

জুমের ধান পাকলে একট সুঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। শুধু পাকা ধান নয়, সবুজ জুমের ধান থেকেও সুমধুর সুগন্ধ আমরা পাই। সুন্দর গোছালো সোনালি রঙের ধানের শীষ মাথা নুইয়ে যেন সবাইকে স্বাগত জানায়। হালকা বাতাসে ধানের শীষের নৃত্য কতই না মনমোহিনী হয়। জুমের পাশে বনে বনে ছোট ছোট পাখি ডাকে সুমধুর সুরে। জুম ও প্রকৃতির সঙ্গে, পাখ-পাখালির সঙ্গে, জীব বৈচিত্র্যের সঙ্গে জুমের একটা নিবিড় সম্পর্ক থাকে। তোতা পাখি, ঘুঘু, উগুরিক (মুনিয়া), বাধোই (বটেরা), প্রভৃতি পাখির সঙ্গে জুম আর জুম চাষির সম্পর্ক হয় কখনও দূরত্ব কখনও ঘনিষ্ঠতার।

তোতা পাখির ঝাঁক এসে কখনও জুমের ধান খেয়ে জুম চাষিকে অতিষ্ঠ করে। অন্যদিকে বটেরা (বাধোই) পাখির প্রতি জুম চাষির আলাদা একটা দরদ আছে। জুম চাষিদের বিশ্বাস প্রচলিত আছে- জুমে যদি বটেরার বাসা থাকে তাহলে সেই জুমের মালিক বা গৃহস্থের ঘরে ওই বছর অবশ্যই ফসল উঠবে। আর ফসল ঘরে ওঠা মানেই পরিবারে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি উন্নতি- সব কিছুই।

যুগ যুগ ধরে জুম চাষিরা কত সুন্দর সুন্দর বিশ্বাস মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে পরম মমতায় লালন করে আসছেন। এই সাদাসিধে সরল-সুন্দর বিশ্বাসগুলোকে সাংঘাতিকভাবে শ্রদ্ধা করা যায় এগুলো অন্ধবিশ্বাস নয়, এগুলো জুম চাষিদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। জুম চাষিদের স্বপ্নগুলো সুন্দর এবং সরল। সেসব ছোট ছোট স্বপ্নে কোনো লোভ ছিল না। স্নেহ-ভালোবাসায় পূর্র্ণ ছিল সেসব স্বপ্ন ও আশা, সবাই মিলে সুখে শান্তিতে থাকার স্বপ্ন। আগামী এক বছরের খোরাকি হলেই গৃহস্থের মুখে প্রশান্তির হাসি লেগে থাকে।

আগেকার দিনে জুম চাষিদের জীবনে কোনো দেশ বা রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল না। ছিল শুধু সুখের সংসারের স্বপ্ন এবং সুন্দর একটা জীবন ও পৃথিবী। আকাশে কিংবা উপরে একজন উপরওয়ালার প্রয়োজন ছিল, তাই তাঁকে সযতনে উপরে রেখে দিত তাঁদের বিশ্বাস। সেই উপরওয়ালা সুন্দর বিচার করেন। এমনই ছিল জুম জীবন। জুম চাষিদের উচ্চাকাক্সক্ষা থাকত না। বড়লোক, লাখপতি, কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন তাঁদের চোখে ছিল না। শিক্ষিত হওয়ার ইচ্ছা হতো না তাঁদের। কারণ পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং সভ্যতা তাঁদের জীবনযাত্রার জন্য যথেষ্ট ছিল। সুন্দর একটি প্রাকৃতিক পরিবেশ, সময়মতো বৃষ্টিপাত হোক- সেটাই ছিল জুম চাষিদের প্রার্থনা।

জুম জীবনে চাকমাদের উভোগীত অত্যন্ত জনপ্রিয়। উভোগীত শুনে সন্ধ্যা রাতে সন্ধ্যা তারা নিয়ে কল্পনার রাজ্যে ভেসে যাওয়া যায়। দাদু-নানুর পচ্ছন (রূপকথা) শুনে জুম ঘরে ঘুম আসে। হাসি, গান, স্বপ্ন, প্রেম সব কিছুরই উপস্থিতি থাকে। রাতের বেলায় জুমের পাশে গাছের ডালে বড় বসন্ত বাউড়ির সুন্দর গান শোনা যায়। দোপাটি, গাঁদা, জগন্নাদি সদরক ফুলসহ নানা প্রজাতির ফুলে ফোটে জুমে।

জুমে পাখি তাড়ানোর জন্য ‘বাদোল’ থাকে। ধান সংগ্রহের জন্য ‘বারেং’ (জুমের কাটা ধান মজুদ রাখার বড় ঝুড়ি) ও হাচ্চেং (জুম থেকে উৎপাদিত ফসল বহন কাজে ব্যবহৃত বড় ঝুড়ি বিশেষ) থাকে। তরকারি ও অন্যান্য জিনিস সংগ্রহের জন্য কাল্লোং, পুল্যাং (মাঝারি আকারের ঝুড়ি) ব্যবহৃত হয়। ধান বপনের জন্য সুচালো আকারের পুরনো দা ব্যবহার হয়, চাকমা ভাষায় সেটার নাম হেগা তাগল। পাকা ধান কাটার জন্য কাস্তে ব্যবহার এখন প্রচলিত আছে, ধান ভাঙার জন্য ঢেঁকি- এসবই জুম জীবনের অপরিহার্য উপাদান।

জুম জীবনে ছিল না জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাণী বৈচিত্র্যের হুমকির কথা, লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার কথা। ছিল না সৌরবিদ্যুৎ। তবে বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখি এবং প্রবল বৃষ্টিপাত ছিল। নোন্যা শিল’র (বেলে মাটির পাথুরে অংশ-নোন্যা শিল) পানির কুয়া ছিল। মৃগয়া ছিল। শিকার ছিল। কার্তুজের বন্দুক ছিল। পাহাড়ি জীবনের সঙ্গে জুমের সম্পর্ক ও ইতিহাস শত শত বছরের। জুম পাহাড়িদের নতুন প্রজন্মকে তাদের পূর্ব পুরুষের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এক সুন্দর সাম্যবাদী সমাজ ছিল জুম জীবনে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine
Google search engine

Most Popular