Thursday, July 30, 2026
Google search engine
Homeআন্তর্জাতিকভারতে জেন–জিদের আন্দোলনে অনীহা, ‘দেশবিরোধী’ তকমার ভয়

ভারতে জেন–জিদের আন্দোলনে অনীহা, ‘দেশবিরোধী’ তকমার ভয়

ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ হচ্ছে ২৫ বছরের নিচের তরুণ প্রজন্ম, যাদের সংখ্যা ৩৭ কোটির বেশি। তাঁরা জনসংখ্যার শুধু বিশাল অংশই নয়; অস্থির ও ডিজিটালি সংযুক্ত এক প্রজন্ম।

স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই তরুণদের রাজনীতি, দুর্নীতি, বৈষম্য নিয়ে প্রতিনিয়ত খবরের সঙ্গে যুক্ত রাখে। তবু রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা তাঁদের কাছে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও দূরের ব্যাপার। ‘দেশবিরোধী’ তকমা পাওয়ার ভয়, প্রাদেশিক ও জাতিভিত্তিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ, আর এ বিশ্বাস যে প্রতিবাদ করেও তেমন পরিবর্তন হবে না—সব মিলিয়ে তাঁদের উদ্দীপনা দমে যায়।

ভারতের জনগনের মধ্যে কিছু অসন্তোষ ক্ষীণভাবে দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে হিমালয়–সংলগ্ন বিতর্কিত লাদাখ অঞ্চলে রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনার পর অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক একে ‘জেন–জিদের অস্থিরতা’ ও দমিয়ে রাখা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে বর্ণনা করেন।

জাতীয় রাজনীতিতেও এ পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘জেন–জি তরুণেরা ভোট জালিয়াতি ঠেকাবেন এবং সংবিধান রক্ষা করবেন।’ কর্ণাটকে ব্যাপক নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তোলার পর এ মন্তব্য করেন তিনি।

আঞ্চলিক অস্থিরতা, বিশেষ করে নেপালসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের পর দিল্লির পুলিশপ্রধান নাকি তাঁর বাহিনীকে রাজধানীতে তরুণদের সম্ভাব্য বিক্ষোভের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

এ নিয়ে অনলাইনে বিতর্ক বাড়ছে, আর তা গভীরভাবে বিভক্তও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিট ও এক্সের কিছু ব্যবহারকারী ভারতের তরুণদের আহ্বান জানাচ্ছেন, নেপালের মতো প্রতিবাদ শুরু করতে। আবার অনেকে নেপালের সহিংসতার দিকটি মনে করিয়ে দিয়ে ‘নেতৃত্বহীন বিদ্রোহকে’ রোমান্টিক না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তথ্যযাচাই প্ল্যাটফর্ম বুমলাইভ বলছে, জেন–জি প্রজন্মের মধ্যেই চলছে এক ‘অনলাইন যুদ্ধ’—এক পক্ষ এসব বিক্ষোভ ন্যায়বিচারের দাবি হিসেবে দেখছে। অন্য পক্ষ মনে করছে, এগুলোর পেছনে বিদেশি প্রভাব থাকতে পারে।

১৯৭০–এর দশকের মাঝামাঝি ইন্দিরা গান্ধীবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ক্যাম্পাস বিক্ষোভ—ভারতের ছাত্ররাজনীতি সব সময়ই দৃষ্টি কেড়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা সন্দেহ পোষণ করেন, দেশটির তরুণেরা নেপাল বা বাংলাদেশের মতো কেন্দ্রীয় সরকার বদলাতে পারবে কি না। কারণ, ভারতের জেন–জি প্রজন্ম বিভক্ত। অন্য দেশের তরুণদের মতো তাঁরাও বেকারত্ব, দুর্নীতি ও বৈষম্যে হতাশ। কিন্তু তাঁদের ক্ষোভ সাধারণত স্থানীয় ইস্যু ঘিরে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সম্ভাবনা কম।

‘আমাদের এক করার মতো কোনো শক্তি আমি দেখি না’, বললেন ২৬ বছরের সাংবাদিক বিপুল কুমার। বিহারের এ তরুণ বাসিন্দা বলেন, ‘ভারতে ক্ষমতা নেপালের চেয়ে অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত, তরুণদের ক্ষোভও তেমনই ছড়িয়ে–ছিটিয়ে। আমি চাই, কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানো হোক, কিন্তু অনেক তরুণের একমাত্র চাওয়া সরকারি চাকরি

এটি অনেক কারণের একটি, যে জন্য জেন–জি বিপ্লবের ক্ষেত্রে ভারত ‘ব্যতিক্রম’ হয়ে থাকবে বলে মনে করেন ‘সেন্টার ফর ইয়ুথ পলিসি’র বিশেষজ্ঞ সুধাংশু কৌশিক। তাঁর কথায়, ‘বয়সই শুধু পার্থক্য সৃষ্টিকারী নয়। ভারতে তরুণেরা রাজ্য, ভাষাভিত্তিক ও জাতিগত পরিচয়ে দৃঢ়ভাবে বিভক্ত; যা প্রায়ই তাঁদের একে অন্যের বিপরীতে দাঁড় করায়।’

‘ধরা যাক, ভারতে যদি কোনো জেন–জি আন্দোলন হয়; তবে সেটা কি দলিত তরুণদের, না শহুরে তরুণদের, না তামিলভাষীদের? সত্য হলো, ভারতে জেন–জি কমিউনিটি নানা স্বার্থের সমষ্টি। তাঁদের এক জায়গায় আনা কঠিন’, বলেন কৌশিক। তিনি একজন তরুণ কর্মী। ভারতীয় তরুণদের নিয়ে একটি বইও লিখেছেন তিনি।

অর্থাৎ শহুরে তরুণেরা চাকরি ও অবকাঠামো নিয়ে সোচ্চার হতে পারেন; দলিত তরুণেরা যাঁরা একসময় ভারতের জাতিভিত্তিক ব্যবস্থায় ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে গণ্য ছিলেন—হয়তো বঞ্চনা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে ঘিরে রাস্তায় নামবেন; আর তামিল তরুণেরা ভাষা, আঞ্চলিক অধিকার বা স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করবেন।

এ ছাড়া বিক্ষোভের কারণ রাজ্যভেদে আলাদা। গুজরাট ও হরিয়ানায় উচ্চবর্ণের তরুণেরা সুযোগ–সুবিধা সংরক্ষণের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন, আর তামিলনাড়ুতে তরুণেরা আদালতের ‘জল্লিকাট্টু’ (ষাঁড় নিয়ন্ত্রণের খেলা) নিষিদ্ধের রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন।

এ বিভাজনের সঙ্গে আরেকটি বাধা যুক্ত হয়েছে, ‘দেশবিরোধী’ তকমার ভয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রিধারী ২৩ বছর বয়সী ধৈর্য চৌধুরীর ভাষায়, ‘সবচেয়ে সচেতন ও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত তরুণেরাও এ ভয়েই রাস্তায় নামতে চান না।’ ভারতে কিছু রাজনীতিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক প্রায়ই ভিন্নমত প্রকাশকারীদের এই তকমা দিয়ে হেয় করেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine
Google search engine

Most Popular

Recent Comments